মানুষের মাথার চুল এত লম্বা কেন?—প্রশ্নটা মনে আসা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আসলে এটি জীববিজ্ঞানের এক বড় রহস্য। পৃথিবীর আর কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাথায় এমন চুল নেই, যা বছরের পর বছর বাড়তে পারে। অথচ আফ্রিকা থেকে ইউরোপ, এশিয়া থেকে আমেরিকা—সব জায়গায় মানুষের মাথায় লম্বা চুল দেখা যায়।

গবেষকরা বলছেন—এটি কাকতালীয় নয়, মানুষের বিবর্তনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

২০০৪ সালে চীনা নারী শি চিউপিং সবচেয়ে লম্বা চুলের জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েন। তার মাথার চুলের দৈর্ঘ্য ছিল ৫ দশমিক ৬২৭ মিটার, যা প্রায় একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ জিরাফের দৈর্ঘ্যের সমান! যদিও এটি খুবই বিরল ঘটনা। তবে লক্ষণীয় হলো, মানুষের শরীরে লোমের তুলনায় মাথার চুল অনেক লম্বা হয়।

মানুষের মাথার লম্বা চুল নিয়ে গবেষণা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় জীববিজ্ঞানী মাকসিম প্লিকাস, পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্ববিদ নিনা জ্যাবলনস্কি ও ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটির চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ সুং-জান লিন।

ব্রিটিশ জার্নাল অব ডার্মাটোলজিতে তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তারা আলোচনা করেছেন—মানুষের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি কেন এবং কীভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। তারা আরও ধারণা দিয়েছেন, কোন ধরনের জিনগত প্রক্রিয়া মানুষের মাথার চুলকে লম্বা ও ঘন করে। শুধু তাই নয় মানুষের মাথার চুল কেন এত লম্বা হয়, এর সম্ভাব্য কারণ ও জৈবিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রস্তাব করেছেন তারা।

এই গবেষকদের এক তত্ত্ব অনুসারে, প্রায় তিন লাখ বছর আগে যখন আফ্রিকায় আধুনিক মানুষের (Anatomically Modern Humans) বিকাশ হচ্ছিল, তখন তাদের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সূর্যের তীব্র তাপ। মানুষ সোজা হয়ে হাঁটতে শুরু করায় সূর্যের তাপ সরাসরি মাথায় এসে পড়ত। এতে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত গরম হয়ে যেত। ফলে বাইরের কাজ করা অনেক কঠিন হয়ে উঠত। মানুষকে তখন খাবারের খোঁজে দীর্ঘ সময় বাইরে ঘুরতে হতো।

এটি মোকাবিলায় মাথার চুল হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক সমাধান। ঘন ও লম্বা চুল সূর্যের আলো সরাসরি মাথার ত্বকে পড়তে দেয় না। ফলে মাথা ঠাণ্ডা থাকে। অতিরিক্ত ঘামও হয় না।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোঁকড়ানো ও ঘন চুল তাপ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ছিল। এ কারণেই আফ্রিকার প্রাচীন মানুষের মধ্যে ঘন ও লম্বা চুলের আধিক্য দেখা যায়।

ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র ও মিশরের মমিগুলোও এ ধরনের ইঙ্গিত দেয়। এসব গুহাচিত্র ও মমিতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে লম্বা চুল দেখা গেছে।

গবেষকরা বলছেন, প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর মাথার লম্বা ও কোঁকড়ানো চুল সূর্যের তাপ থেকে মাথার ত্বক রক্ষায় বিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। কারণ কোঁকড়া চুলের ফাঁকে থাকা বাতাস তাপ পরিবহন কমাতে সাহায্য করত এবং ঘাম কমিয়ে পানির অপচয়ও ঠেকাত।

নৃতত্ত্ববিদ নিনা জ্যাবলনস্কি বলেন, 'মানব বিবর্তনের পুরো সময়ে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া খুব কঠিন ছিল। তাই এমন কোনো তাপ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা দরকার ছিল, যা শরীরে পানি সংরক্ষণে সাহায্য করবে।'

যদিও ঠিক কবে কোঁকড়ানো চুলের উদ্ভব হয়েছিল, তা জানা যায় না। ধারণা করা হয়—কোঁকড়ানো চুল সহজে ক্ষয়ে বা ভেঙে যেত। তাই বিকল্প হিসেবে পরে লম্বা চুলের ধারণা বিকাশিত হয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাথার লম্বা চুলের কাজ শুধু তাপ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সামাজিক সংকেতও। কার বয়স কত, সুস্থ না অসুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক না শিশু—এমন অনেক কিছুই এক সময়  চুলের মাধ্যমে বোঝানো হতো।

গবেষকেরা বলছেন—লম্বা ও স্বাস্থ্যবান চুল মানে ভালো পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য। অন্যদিকে, চুল পাতলা হওয়া বা পড়ে যাওয়া রোগ বা অপুষ্টির ইঙ্গিত দেয়। এই কারণেই চুল পড়া মানুষের মধ্যে অনেকে আজও মানসিক চাপ বোধ করেন।

প্রাচীন সমাজে চুল সাজানো, বেণি করা বা বিশেষ স্টাইল তৈরি করাও ছিল সামাজিক অবস্থান জানানোর উপায়।

কার মাথার চুল কতটা লম্বা হবে তা নির্ভর করে চুলের বৃদ্ধি চক্রের ওপর। বৈজ্ঞানিকভাবে চুল বাড়ার নির্দিষ্ট চক্র আছে। এই চক্রের তিন ধাপের প্রথমটি হলো 'অ্যানাজেন', দ্বিতীয়টি 'ক্যাটাজেন' ও শেষ ধাপ 'টেলোজেন'।

বলা রাখা দরকার—'অ্যানাজেন' পর্যায়ে চুল সক্রিয়ভাবে বাড়তে থাকে। 'ক্যাটাজেন' পর্যায়ে চুলের বৃদ্ধি বন্ধ হয় এবং 'টেলোজেন' ধাপে চুল ঝরে পড়ে।

বিজ্ঞানের ভাষ্য—'অ্যানাজেন' পর্যায়ে কিছু উদ্দীপক চুলের গোঁড়ার ভেতরে থাকা ম্যাট্রিক্স কোষগুলোর দ্রুত বিভাজন ঘটায়। ফলে চুল ধীরে ধীরে লম্বা হয়। তাই চুল দীর্ঘ সময় বাড়তে দিতে হলে এসব কোষের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ থাকা জরুরি।

প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর মানুষের মাথার একটি চুলের গোঁড়া 'অ্যানাজেন' পর্যায়ে থাকে। এই সময়ে চুল সাধারণত ৫০ থেকে ১১০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১৯ থেকে ৪৩ ইঞ্চি) লম্বা হয়।

মাকসিম প্লিকাস বলেন, 'চুলের গোঁড়াকে একধরনের জীবন্ত থ্রিডি প্রিন্টারের মতো বলা যায়। আপনি যে ধরনের নির্দেশনা দেবেন, এটি সে অনুযায়ী ছোট বা অত্যন্ত লম্বা কিছু 'প্রিন্ট' করবে। এজন্য নতুন উপাদান যোগ করার দরকার নেই। শুধু কোষগুলোকে আরও দীর্ঘ সময় কাজ করতে দিতে হবে।'

গবেষকেরা চুলের বৃদ্ধি বন্ধের ব্যবস্থাকে একটি জৈবিক 'ব্রেক' বা 'চেকপয়েন্ট' বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সাধারণত শরীরের লোমে এই ব্রেক খুব কার্যকর হয়। তাই লোম নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের পর আর বড় হয় না বা থেমে যায়। কিন্তু মানুষের মাথার চুলে এই ব্রেক তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে চুল বাড়তেই থাকে, কখনো কখনো বহু বছর ধরে তা অব্যাহত থাকে।

এই ব্যবস্থাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'চেকপয়েন্ট সি'। মানুষের বিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে এই চেকপয়েন্টটি মাথার চুলে শিথিল হয়ে গেছে বলে গবেষকদের ধারণা।

মানুষের মাথার চুলের মতো এত লম্বা চুল আর কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর নেই। তবে লম্বা চুল শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সিংহের কেশর, ওরাংওটাংয়ের লম্বা লোম, ভিন্ন জাতের কুকুর, বিড়াল বা গরুর লম্বা পশম দেখে বোঝা যায়, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে লম্বা চুল গজানোর ক্ষমতা আগে থেকেই ছিল। মানুষ এই ক্ষমতা নতুন করে তৈরি করেনি—এমনটাই গবেষকদের ব্যাখ্যা।

উদাহরণ হিসেবে আরও বলা যায়—অ্যামাজনের 'এমপেরর তামারিন' বানরের পাতলা গোঁফের মতো লোম কিংবা এখন বিলুপ্ত 'উলি ম্যামথের' শরীরে এক মিটার পর্যন্ত লম্বা লোমের ঝুলে থাকা স্তর।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেসব চর্মরোগে চুলের দৈর্ঘ্য অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়, সেগুলো নিয়ে গবেষণা করলে মানুষের মাথার চুল এত লম্বা হওয়ার পেছনের অনুগত ভিত্তি ও জিনগত নিয়ন্ত্রকদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে ফাইব্রোব্লাস্ট গ্রোথ ফ্যাক্টর–৫ (এফজিএফ৫) নামের একটি প্রোটিনের কথা বলা যায়। এই প্রোটিন চুলকে ক্যাটাজেন পর্যায়ে প্রবেশে সাহায্য করে। এই জিনে মিউটেশন হলে ফ্যামিলিয়াল ট্রাইকোমেগালি নামক একটি অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে শরীরের লোম ও চোখের পাপড়ি অস্বাভাবিকভাবে অনেক লম্বা হয়ে যায়। কারণ এই মিউটেশন শরীরজুড়ে চুল বৃদ্ধির পর্যায়কে (অ্যানাজেন) দীর্ঘ করে। ধারণা করা হচ্ছে, মাথার ত্বকের কোষে এই জিনটি তার নিয়ন্ত্রক উপাদানের পরিবর্তনের মাধ্যমে আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

এর বিপরীতে, ডাব্লিউএফএম১০এ নামের একটি প্রোটিনের ভিন্ন রূপ অ্যানাজেন পর্যায়ের সময় কমিয়ে দেয়। এর ফলেই অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়া অর্থাৎ পুরুষদের টাক পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মাথার ত্বকের ভেতরে থাকা ডার্মাল প্যাপিলা সেল নামের বিশেষ কোষগুলো চুল কতদিন বাড়বে তা নিয়ন্ত্রণ করে। এই কোষগুলোর আচরণ মাথায় একরকম, শরীরের অন্য জায়গায় আরেকরকম। জিন ও জিন-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পার্থক্যের কারণেই মাথার চুল এত আলাদা বৈশিষ্ট্য পেয়েছে বলে জানান গবেষকরা।

মানুষের মাথার চুল নিয়ে এই রহস্য ভেদ করতে বিজ্ঞানীরা এখন আরও গভীরভাবে গবেষণা শুরু করেছেন। শরীরের লোম ও মাথার চুলের তুলনামূলক গবেষণা, আরএনএ সিকোয়েন্সিং ও আধুনিক স্পেশাল সিকোয়েন্সিং পদ্ধতি ব্যবহার, মানুষের চুল প্রাণীর (যেমন ইঁদুরের) দেহে প্রতিস্থাপন করে পরীক্ষা, চুলের বৃদ্ধি নিয়ে কম্পিউটার মডেল তৈরি এবং ব্যক্তিভেদে চুল বৃদ্ধির সূক্ষ্ম পার্থক্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষের চুল বৃদ্ধির কারণগুলো বোঝা সম্ভব হতে পারে বলে গবেষকরা মনে করছেন।

মাথার চুল কীভাবে এত লম্বা হয়, এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেলে চুল পড়া বা জন্মগতভাবে চুল ছোট থাকার মতো সমস্যার নতুন চিকিৎসার পথও খুলে যেতে পারে।

কিছু বিরল রোগে মানুষের চোখের পাপড়ি বা শরীরের লোম অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে যায়, আবার কারও মাথার চুল ছোটই থাকে। এই রোগগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা চুল বৃদ্ধির জৈবিক রহস্য আরও ভালোভাবে বুঝতে পারছেন।

ভবিষ্যতে এসব গবেষণা চুল পড়া বা টাক রোধের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে বলেও আশা করছেন তারা।